January 5, 2026, 8:36 pm

শুভব্রত আমান/
মৃদু শৈতপ্রবাহের কবলে পড়া কুষ্টিয়া হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলেনি ; কুয়াশার আড়ালে স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কুষ্টিয়াসহ সাত জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
রোববার সকালে দেওয়া আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ওপর দিয়ে বর্তমানে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এ শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব আগামী কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে সংস্থাটি।
কুষ্টিয়ায় শীতের দাপট/
শৈত্যপ্রবাহের তালিকায় কুষ্টিয়া থাকায় জেলার গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শীতের প্রকোপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভোররাত ও সকালে তাপমাত্রা নেমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক ও বয়স্করা। নদীঘেরা কুষ্টিয়ার চরাঞ্চল ও খোলা মাঠের এলাকায় শীতের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
ঘন কুয়াশার কারণে সকালে সড়কে যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ছে। কুষ্টিয়া–ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া–রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া–পাবনা সড়কে দূরপাল্লার যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে চালকদের অভিযোগ।
দিন-রাতের তাপমাত্রার ওঠানামা/
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি সারাদেশেই অব্যাহত থাকবে।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। ফলে বৃষ্টির সম্ভাবনা না থাকলেও কুয়াশা ও ঠান্ডার দাপট কমবে না।
শীতের পেছনের আবহাওয়াগত কারণ/
আবহাওয়া অফিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। অন্যদিকে, মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার একটি বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এই দুটি আবহাওয়াগত ব্যবস্থার প্রভাবে দেশের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শীতের প্রকোপ বাড়ছে।
দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা/
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, আজ রোববার সকাল ৬টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে—৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হচ্ছে।
জনজীবনে প্রভাব/
শীতের কারণে কুষ্টিয়ায় সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। খেটে খাওয়া মানুষজন প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চাইছেন না। অনেক এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চিত্রও চোখে পড়ছে। কুষ্টিয়া শহরের ভোরের চিত্র যেন প্রতিদিন একই রকম—রাস্তার মোড়ে মোড়ে চা-স্টলগুলোয় আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করছেন শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুরেরা কাজে বের হলেও যাত্রী কম, কাজ নেই বললেই চলে। অনেকেই ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয়ে কাজে নামতে পারছেন না।
একজন ভ্যানচালক বলেন, “সকালবেলা যাত্রীই নাই। ঠান্ডায় হাত-পা জমে আসে। কাজ না করলে খাই কীভাবে, আবার বের হলেও লাভ হয় না।”
শহরের বাইরে কুষ্টিয়ার গ্রামাঞ্চলে শীতের তীব্রতা আরও বেশি। নদীঘেঁষা চরাঞ্চলে ঠান্ডা বাতাস সরাসরি এসে লাগে। খোলা ঘরে থাকা দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য রাত কাটানো হয়ে উঠছে কষ্টকর। অনেক পরিবার পুরোনো কাপড়, চট বা পলিথিন দিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে।
কৃষিশ্রমিকরা জানাচ্ছেন, সকালে মাঠে কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে। কুয়াশার কারণে ফসল তোলা বা জমিতে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
সবজি ও বোরো বীজতলায় শীতের চাপ/
কুষ্টিয়া জেলার কৃষিতে শীতকালীন সবজির বড় ভূমিকা রয়েছে। শীতের কারণে কিছু সবজিতে বৃদ্ধি ধীর হয়ে গেছে। বিশেষ করে শসা, লাউ, বেগুন ও টমেটোর গাছে ঠান্ডাজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে কৃষকদের অভিযোগ।
একই সঙ্গে বোরো ধানের বীজতলায় কুয়াশা ও ঠান্ডার প্রভাব পড়ছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন কুয়াশা থাকলে চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
পানের বরজে বাড়তি সতর্কতা/
কুষ্টিয়ার পানের বরজ এই অঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসল। শীত ও কুয়াশার কারণে বরজে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় পানে ছত্রাকজনিত রোগের আশঙ্কা করছেন চাষিরা। অনেকেই খড়, পলিথিন ও পর্দা ব্যবহার করে বরজ ঢেকে রাখছেন, যা বাড়তি খরচের কারণ হচ্ছে।
একজন পানচাষি বলেন, “ঠান্ডা আর কুয়াশায় পানের পাতা নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। যতœ বাড়াতে হচ্ছে, খরচও বেড়ে গেছে।”
শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি ভোগান্তি/
শীতের সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে শিশু ও বয়স্কদের ওপর। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ঠান্ডাজনিত সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সকালে স্কুলে যেতে অনীহা দেখা যাচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে। অভিভাবকেরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
একজন মা বলেন, “ভোরে এত ঠান্ডা যে বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। তবুও বাধ্য হয়ে পাঠাতে হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈত্যপ্রবাহ চলাকালে শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বাড়তি যতœ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শীতজনিত রোগ—সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট এড়াতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
নীরব শীতের লড়াই/
শীতের এই নীরব লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ। কাজ কম, আয় নেই—এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঠান্ডার কষ্ট। কুষ্টিয়ার গ্রাম-শহরের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে একটু রোদের আশায়, একটু উষ্ণতার অপেক্ষায়।